বয়সটা পেরিয়ে গেছে ৩৮। কদিন পর হবে ৩৯। বিশ্বকাপ শুরুর আগে খানিকটা সংশয় ছিল মেসির খেলা নিয়ে। কিন্তু ধীরে ধীরে নিজেকে ফিট প্রমান করলেন ফুটবলের জাদুকর।
আর বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে দেখালেন জাদু। শুধু জাদু বললে ভুল হবে। এ যেন মহাজাদু। ৩৫ পেরুতেই যেখানে বেশিরভাগ ফুটবলার নিজের বুট জোড়া তুলে রাখেন সেখানে মেসি যেন প্রথম থেকেই শুরু করছেন। ফুটবলারটির নাম যখন লিওনেল মেসি, তাকেতো আর সাধারণ হিসাবের গ-িতে তাকে আটকে রাখা যায় না।
এই বয়সেও নতুন ইতিহাস লিখলেন তিনি বিশ্বকাপে নিজের প্রথম হ্যাটট্রিক উপহার দিয়ে। সে সাথে বিশ্বকাপ ইতিহাসে গোল দাতার তালিকায় পৌঁছে গেলেন সবার উপরে। অধিনায়কের অবিস্মরণীয় দিনটিতে বড় জয়ে শিরোপা ধরে রাখার অভিযান শুরু করল তিনবারের বিশ্বজয়ী আর্জেন্টিনা।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যানসাস সিটিতে আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। খেলার প্রথমার্ধে ১-০ গোলে এগিয়ে ছিল লিওনেল মেসির দল। বা পায়ের পাশপাশি এবার ডান পায়ের জাদুও দেখালেণ মেসি।
আজ বুধবার ক্যানসাসের অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে নেমেই ইতিহাসে নাম লেখান মেসি। আর তা হচ্ছে ছয়টি বিশ্বকাপ খেলা প্রথম ফুটবলার তিনি।
আর্জেন্টিনার প্রথম ফুটবলার হিসেবে ছুঁয়ে ফেলেন ম্যাচ খেলার ডাবল সেঞ্চুরিও। এমন দিনে মেসি কি আর থেমে থাকতে পারে? তাইতো তিনি থামেননি। দিনটিকে তিনি রাঙিয়েছেন ঐন্দ্রজালিক পারফরম্যান্সে। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক গোলটি করার পর তার গোল হলো ১৬ টি।
বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলের তালিকায় মেসি ছুয়ে ফেললেন সাবেক জার্মান ফরোয়ার্ড মিরোস্লাভ ক্লোসাকে। এখন আর একটি গোল করতে পারলেই সবার উপরে চলে যাবেন মেসি।
২০০৬ সালের ১৬ জুন যখন বিশ্বকাপে খেলতে নামেন মেসি। তখন তিনি ছিলেন আর্জেন্টিনার সর্বকনিষ্ঠ গোলস্কোরার । ১৮ বছর ৩৫৮ দিন বয়সে গোল করেছিলেন এই জাদুকর। ঠিক ২০ বছর পর আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বেশি বয়সী গোলস্কোরারও হলেণ মেসি।
সব মিলিয়ে মেসিময় হয়েই থাকল আলজেরিয়ার বিপক্ষে বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের ম্যাচটি। ব্রাজিল, স্পেনের মত দল পয়েন্ট হারিয়ে শুরু করেছে। তাই খানিকটা খসখসানি ছিল আর্জেন্টাইন সমর্থকদের মধ্যে। কিন্তু মেসি যখন দ্যুতি নিয়ে হাজির হন তখন কোন শংকাই ঠিকে থাকতে পারেনা।
যদিও ম্যাচের শুরু থেকে প্রতিদ্বন্দ্বীতার একটা আভাস মিলছিল। বলতে গেলে প্রথম দশ মিনিটে লড়াইটা ছিল সমানে সমান। যদিও এরই মধ্যে খেলার চতুর্থ মিনিটে একটা সুযোগ এসেছিল আর্জেন্টিনার সামনে। কিন্তু লাউতারো মার্তিনেসের দুর্বল হেড সহজেই ধরে নেন আলজেরিয়ার গোলকিপার লুকা জিদান।
পরের মিনিটেই আসে গোল। এবার লাওতারো মার্তিনেসের কাছ থেকে বল পেয়ে বাঁ প্রান্ত দিয়ে ভেতরে ঢুকেন মেসি। কিংবদন্তী জিনেদিন জিদানের ছেলে লুকা জিদানের পাশ দিয়ে বল জালে জড়ান মেসি। কিন্তু বিধি বাম। গোলটি বাতিল হয়ে গেল ।
কারন মেসি ছিলেন অফসাইডে। দুই মিনিট পর একই ঘঠনা ঘটাল আলজেরিয়া। ডি বক্সের একটু বাইরে থেকে আর্জেন্টিনার তিনজনের মধ্য থেকে চোখধাঁধানো পাস বাড়ান ফারিদ এল মেলালি শেইবি। সেই বল ধরে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে বল জালে জড়ান এহমেদ কেন্দুসি মাজা। কিন্তু আলজেরিয়ানদের উল্লাসের পর ভিএআর রেফারি জানান অফসাইডের সিদ্ধান্ত।
মজার বিষয় হচ্ছে কেন্দুসি মাজার বাড়িয়ে ধরা বাঁ হাতটুকু ছিল শুধু অফসাইডে।
দু দলের দুটি গোল দুই মিনিটের ব্যবধানে অফসাইাডের কারনে বাতিল হয়ে যাওয়ার পর ১৭ মিনিটেই মেসির জাদুর ঝলক। নিজের বডিগার্ড খ্যাত রদ্রিগো দে পল মাঝমাঠ থেকে বল বাড়ান মেসির দিকে।
বল দিয়ে দ্রুত একটু এগিয়ে বক্সের বাইরে থেকে দুই ডিফেন্ডারের মাঝ দিয়ে বাঁ পায়ের সেই ট্রেডমার্ক শট। গোলকিপার জিদানের কিছু করার ছিল না। উড়ন্ত ডাইভ দিয়েও বলের নাগাল পাননি তিনি। এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা।
পরিসংখ্যান বলছে বিশ্বকাপে বক্সের বাইরে থেকে এটি মেসির পঞ্চম গোল। ১৯৬৬ আসর থেকে এখনও পর্যন্ত যা বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ।
এখানে আরো একটি কাকতালীয় ঘটনা ঘটে গেছে। তা হলো ২০০৬ বিশ্বকাপে মেসির অভিষেক আসর ছিল কিংবদন্তি জিনেদিন জিদানের শেষ বিশ্বকাপ। ২০ বছর পর সেই মেসি নিজের শেষ বিশ্বকাপে গোল করলেন জিদানের ছেলের বিপক্ষে। এগিয়ে যাওয়ার পর বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে খেলতে থাকে আর্জেন্টিনা। যদিও ম্যাচ শেষে দেখা গেছে বল দখলে এগিয়েছিল আলজেরিয়া।
৩৭ মিনিটে প্রায় ৪০ মিটার দূর থেকে ফ্রি কিকে সরাসরি গোলের চেষ্টা করেছিলেন মেসি। কিন্তু বল চলে যায় বেশ ওপর দিয়ে। যদিও এধরনের ফ্রিকিক থেকে অনেক গোল করেছেন মেসি। কিন্তু আজ হলোনা। ৩৯ মিনিটে সমতা ফেরানোর একটা হাফ চান্স পেয়েছিল আলজেরিয়া। কিন্তু শেইবির শট এমি মার্তিনেস ফিরিয়ে দিলে সমতা আনা হয়নি আলজেরিয়ার।
দ্বিতীয়ার্ধে আর্জেন্টিনা আবির্ভুত হয় চেনারূপে। ৫১ মিনিটে ডি বক্সের মাথা থেকে শট নিয়েছিলেণ মেসি। কিন্তু তা চলে যায় ক্রসবার উচিয়ে। দুই মিনিট পর মেসির চমৎকার পাস থেকে লাউতারো মার্তিনেসের শট ফিরিয়ে দেন জিদান। ৬০ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুন করে আর্জেন্টিনা। বক্সের অনেক বাইরে থেকে দুর্দান্ত এক শট নিয়েছিলেন মাক আলিস্তেরে।
গড়ানোর শট শুয়ে পড়ে ফিরিয়ে দেন লুকা জিদান। কিন্তু ফিরতি বলটি পেয়ে যান সামনেই ফাঁকায় থাকা মেসি। এমন বল গোলে পরিনত না করে কি আর থাকতে পারন মেসি ? তাইতো আলতো টোকায় বল জালে জড়ালেন এলএমটেন। তার ক্যারিয়ারের সহজ গোলগুলির একটি। গত বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষেও তেমন একটি গোল করেছিলেন মেসি।
ক্যারিয়ারের এত অর্জনের মাঝে একটা অপূর্নতা ছিল মেসির। আর সেটি হচ্ছে বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক। জল্পনার যেন শেষ নেই। পারবেনকি মেসি সে অপূর্নতা ঘুছাতে। ৬৫ মিনিটে পুরন হতে পারতো সে স্বপ্ন। দারুণভাবে বল নিয়ে ছুটছিলেন মেসি। পুরো গ্যালারী তখন দাড়িয়ে। এই বুঝি হ্যাটট্রিক হয়ে গেল। কিন্তু না, মেসির বাঁ পায়ের আরেকটি গোলা দারুণ দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন জিদান।
খেলার ৭৬ মিনিটে আসে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি । আলজেরিয়ার একটি আক্রমন নস্যাৎ করে পাল্টা আক্রমণে যায় আর্জেন্টিনা। নিকো গন্সালেরে কাছ থেকে বল পেয়ে বক্সের ঠিক মাথা থেকে দারুণ এক গড়ানো শটে লুকা জিদানকে পরাস্ত করে মেসি পৌছে যান অনন্য উচ্চতায়।
বিশ্বকাপের প্রথম হ্যাটট্রিক পুরন করে নিলেন মেসি। পৌছে গেলে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার কাতারে সবার উপরে থাকা মিরোস্লাভ ক্লোসার পাশে। ম্যাচ জয় তখন নিশ্চিত। তাই মেসিকে আর মাঠে রাখার প্রয়োজন মনে করলেননা লিওনেল স্কালোনি। ৭৯ মিনিটে তুলে নিলেন মেসিকে।
গোটা গ্যালারি তখন ঠে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানালেণ ফুটবলের এই জাদুকরকে। ম্যাচের বাকি সময়ে আর তেমন কিছু হয়নি। তাইতো মেসিময় ম্যাচে দুর্দান্ত এক জয় দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করল বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
