ত্যাগের মহান মহিমা নিয়ে বছর ঘুরে আবার এসেছে পবিত্র ঈদুল আজহা। আল্লাহর নবী হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সুন্নত অনুসরণ করে বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ এই দিন পশু কোরবানি দিয়ে থাকেন। পবিত্র ঈদুল আজহা আমাদের দেশে ‘কোরবানির ঈদ’ নামে বেশি পরিচিত।
কোরবানির পশু কেনা, তার যত ও পরিচর্যাকে ঘিরে থাকে ঈদের মূল প্রস্তুতি ও আনন্দ। ঈদের দিন ভোরে উঠে পরিচ্ছন্ন পোশাকে ঈদগাহে যেতে জামাতের পর খুতবায় ইমামরা হজরত ইবরাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.)-এর কোরবানির অমর ইতিহাস তুলে ধরেন। কোরবানির সুপ্রাচীন ইতিহাসে থাকে আত্মত্যাগের উদাহরণ।
কোরবানি মানে মহান আল্লাহতায়ালার নৈকট্য লাভ। ত্যাগ। সমর্পণ। কোরবানি মানেই মহান রবের কাছে নিজিকে বিলিয়ে দেওয়ার অনন্য আয়োজন। জীবনকে উৎসর্গ করার সেরা উপলক্ষ।
ঈদুল আজহার দিন ফজর উদিত হওয়ার পর থেকে দ্বাদশতম দিন পর্যন্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী মুসলমানের ওপর কোরবানি ওয়াজিব। কোরবানির দিন মুসলমানদের প্রথম ও প্রধান আমল- ঈদের নামাজ আদায় করা। এরপর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধান হলো- কোরবানি করা।
নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘আজকের দিনে আমরা সর্বপ্রথম ঈদের নামাজ আদায় করব। এরপর ফিরে এসে কোরবানি করব।’ -সহিহ বোখারি: ৯৬৮
নবী কারিম (সা.)-এর সুন্নত অনুসরণ করে পবিত্র ঈদুল আজহা ও কোরবানি করা সব মুসলিমের কর্তব্য। ইসলামের বিধানে ঈদের নামাজের আগে গোসল করা সুন্নত। উত্তম পোশাক পরিধান করা সুন্নত। সুগন্ধি ব্যবহার সুন্নত।
আর ঈদের দিনে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বিশেষভাবে সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর তিনটি পছন্দনীয় জিনিসের মধ্যে একটি হলো সুগন্ধি। তাই ঈদের দিনের পোশাক পরিধানের পর সুগন্ধি ব্যবহার করা চাই।
কোরবানির দিনে ঈদের নামাজের আগে কিছু না খাওয়া মোস্তাহাব। নবী কারিম (সা.) ঈদুল আজহার দিন কিছুই খেতেন না, যে পর্যন্ত ঈদের নামাজ আদায় করতেন। -জামে তিরমিজি
ঈদগাহে এক পথ দিয়ে যাওয়া ও অন্যপথ দিয়ে ফেরা সুন্নত। সম্ভব হলে ঈদগাহে হেঁটে যাওয়াও সুন্নত। আর ঈদের দিন তাকবির পাঠের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালাকে বেশি বেশি স্মরণ করা সুন্নত।
পুরুষেরা এ তাকবির উঁচু আওয়াজে পাঠ করবে, মেয়েরা নীরবে। এ তাকবির জিলহজ মাসের ৯ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত পাঠ করবে।
ঈদের নামাজ সুন্নতে মুয়াক্কাদা। ঈদের নামাজ সব নফল নামাজের মধ্যে ফজিলতপূর্ণ। ঈদের নামাজের আগে ও ফজরের নামাজের পরে কোনো নামাজ নেই। ঈদের নামাজের কোনো আজান ও ইকামত নেই।
ঈদের দিনে ছোট-বড় সবার সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করা সুন্নত। ঈদের দিনে সাহাবায়ে কেরামদের সম্ভাষণ ছিল, ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা।’ অর্থ: আল্লাহ আমাদের ও তোমার কাজ কবুল করুন।
ঈদুল আজহার দিনে সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। ধর্মীয় নির্দেশনা অনুযায়ী কোরবানির গোশত ভাগ হয়ে যায় আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও অসহায়দের মাঝে।
কোরবানির পশু জবাই করার যন্ত্র ভালোভাবে ধার দেওয়া, প্রাণীকে সুন্দরভাবে জবাইয়ের স্থানে নিয়ে যাওয়া ও উত্তমভাবে জবাই করা মোস্তাহাব। নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা তোমাদের ওপর অনুগ্রহ করাকে আবশ্যক করেছেন।
অতএব তোমরা কাউকে হত্যা করলে ভালোভাবে করো। জবাই করলে উত্তম পন্থায় জবাই করো। তোমাদের সবাই যেন ছুরি ধার করে নেয় এবং তার জবাইকৃত পশুকে আরাম দেয়।’ -সহিহ মুসলিম: ৫১৬৭
ঈদুল আজহার দিন কোরবানির জন্তু জবাই করার পর কোরবানি দাতার নখ ও লোম কাটা মোস্তাহাব। নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘যার জবাইয়ের প্রাণী রয়েছে, সে তা জবাই করবে। অতএব যখন জিলহজের চাঁদ উদিত হয়, তখন সে যেন কোরবানির আগ পর্যন্ত তার চুল ও নখের কোনো কিছু না কাটে। -সহিহ মুসলিম: ৫২৩৬
ঈদুল আজহায় পশুর রক্ত, আবর্জনা ও হাড়ের কারণে যেন পরিবেশ দূষিত না হয় সেদিকে প্রত্যেক মুসলিমের সতর্ক হওয়া উচিত। কোরবানি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রক্ত, আবর্জনা ও হাড় নিরাপদ দূরত্বে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলে দেওয়া উচিত। আল্লাহতায়ালা সবার কোরবানিকে কবুল করুন। সবাইকে ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা।